বাঘ বাঘিনীর কাব্য-১

কেমন হতে পারে এ সময়ের প্রেমের দীর্ঘকবিতা বা সহজ বাংলায় একটা বড়ো লেখা। লেখা অসম্ভব? পড়ার সময় নেই? কবিতা কলরবের পর সমস্ত অসম্ভবের ওপর বাঘের মতো লাফিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। ফিনকি দিয়ে নিঃশ্বাস নিয়ে আলোর থাবা নামিয়ে আনি।

আর চেয়ে দেখি কেমন হবে তার চলন বলন উজ্জ্বল ভ্রুভঙ্গিম। এই সেই দীর্ঘ, অনেকদিন বাদে। এবং এটি দীর্ঘ নয়, বহুদিন বাদে কোনোকিছুর নাম দিলাম কাব্য। জানার ইচ্ছে রইলো কেমন দাঁড়াচ্ছে। বা আদৌ দাঁড়াচ্ছে কি না।

এটি হ্যাশট্যাগ লেখক ও কবিতা কলরবের সমস্ত বাঘবাঘিনীদের উৎসর্গ। তাই কোনো পত্রিকায় নয়, এখানে সেই আপনাকেই পড়াচ্ছি, ফেসবুকেই প্রথম। কেউ যদি প্রকাশ করতে চান, এই ফেসবুক প্রকাশিত ভার্সানটি নিতে হবে। পুরো কাব্য কয়েকটি অংশে বিভক্ত।


“তোমাকে বাঘিনী আর আমাকে শিকারকাহিনী বানিয়ে যে বাড়ি চলে গেছে, সেই যদি আমাদের আদর্শ ভগবান হয় তবে আমি তার সুপুরি নিলাম।”

রাইরুহানি কথা-এক

এবার কি মনে হচ্ছে রুহান, তুমি কি সত্যিই অতি সামান্য এক ভ্রমের জন্য মায়ার জন্য আকূল হচ্ছো? কি মনে হচ্ছে এই খাঁ খাঁ যথাযথ না যথাযথ নয়?

আমি অতো জানিনা হে, আমি শুধু জানি তার ওই রুহানির ক্রমে রাই এর বিন্যাসে আমার একমাত্র ভুবন মেলা আছে আর নানান স্বর্ণবর্ণা ধ্বনির একত্র উচ্চারণে যাকে সম্বোধিত করি সেখানে আমার একমাত্র জগৎ খোলা আছে। আমি অতো কিছুই জানিনা, শুধু জানি সে ভুবনের ডাঙা ও জগৎ এর জল নিয়ে আসবে একদিন নিশ্চিত, তাই আমি অর্থহীনে দরাজ গগন হয়ে আছি। যেন দু পাশে কেউ নেই এক একলা হাইফেন ভেসে আছি। সকলে ভাবছে শূন্যে কাটা “এমনি” জাতীয় দাগ। নিশ্চয়ই আমি দাগী, ইতিহাসে প্রমাণিত দাগী, কিন্তু শূন্যে কাটা নয় শূন্যকাটা খাঁ খাঁ কাটা এক ভরাটের দাগী। আমার ভরাট কই? যে ভরাটের মলাট রূপে নিজেকে দেখেছি চিরকাল। বইটি চলে গেছে বহুদূর দুধরাজ পাখিটির বুকের পালকে বসে, বইটি উড়ে গেছে, শূন্য মলাটখানি বড়ো দেখনদারি, বড়ো চমকপ্রদ ভেসে আছি। অন্তর ভর্ত্তি শুধু হু হু আর ধূধূ দের গ্রাম। জল নেই মাটি নেই, ধরো তারা চিরতরে চলে গেছে, জল মাটি একবিন্দুও নেই সেখানে যে আকাশ, সে আকাশকে মহাশূন্য বলে। জল নেই মাটি নেই চলে গেছে, সেখানে যে আকাশ তাতে কোনো আকাশী ঘটবে না। সে আকাশ কোনো উড়ন্ত ধারণে অক্ষম। যেখানে ভুবনের ডাঙা আছে, জগতের জল আছে, সেখানে যে আকাশ সে আকাশের মা ও রয়েছে। তারা না থাকলে আকাশে শুধু অসংখ্য রকম দূরত্বের মাপ পড়ে আছে। আর কিছু নেই, নক্ষত্রহীনতায় মায়ের চিহ্ন নেই।


রাইরুহানি কথা-দুই

আমি অতো কিছুই জানিনা হে। নাও আমার সমস্ত অহং তুমি নাও। নাও সমস্ত মেধা, সমস্ত দক্ষতার ক্রেংকার। যা কিছু অমিত আভাত্ব আছে সব নাও। পরিপূর্ণ শীতল করে সব আভা খুলে নাও। শুধু একত্র উচ্চারণ ও চুমুকের সুযোগমাত্র দাও তোমার ঝিনুক ভাঙার স্রোতে। বাকি সব মুছে যাক, বীজ খুলে নিজ অংকুর ভেঙে ফেলো তুমি। আমার প্রাণের পর মুহূর্তমাত্র ব্যবধান না রেখে তোমাকে উচ্চারণ করি রাই এবং তা শ্রুত হোক। যেখানে তার একমাত্র শ্রবণ সেখানে শ্রমণের বেশেই যাক সেই ডাক। শুধু এইটুকু চাইতে পারি সেটুকু বোধ করতে চাই। বোধ করতে চাই কোথাও, কোনো মানুষে আমার একটি চাওয়া রয়েছে। এটি বোধে পেলে চাওয়াটিই এক অপার পাওয়া স্বরূপ লাগে। কোথাও প্রতিফলিত করতে পারছি না আমি, কোথাও প্রতিসরণে ভেঙে যাচ্ছে না স্বভাব। আমার বস্তু যে ছিলো, সার অংশ যে ছিলো তার অস্ফূট অস্তিত্বও যদি টের পাই তাহলেও ফের গড়ে নিতে পারি নিজেকে। শূন্য থেকে শুরু করতে পারি আমি, রাজি। শূন্যস্থান থেকে কি করে শুরু হতে পারি?
শুধু সময়ের স্ফটিক পরে এসো আর একবিন্দু জলপ্রপাত যেন এহেন প্রগাঢ় নিকট এক স্পর্শতোয়া ভুবন খুলে ফেলে। শূন্যস্থান নয়, মানব মানবীর মাঝে এক স্থানশূন্যতা জন্মায় ঘ্রাণস্বরূপিনী। যেমন ছাতিম ও ছাতিমফুলের গন্ধের মাঝে থাকে।

রাইরুহানি কথা- তিন

যেকোনো দিনেই, দিনের বেলা রাতের বেলার সাথে একের অধিক রুহ্‌বেলা জন্মায় আমার। সকালবেলা, দুপুরবেলা, বিকেলবেলা, সন্ধ্যেবেলা ইত্যাদি বেলাগুলি আলো দিয়ে নিরূপিত হয়। আলোর তারতম্যে বেলান্তর ঘটে এইসব। আর রুহ্‌রুবেলা জন্মায় প্রজননে। আলো থেকে অন্ধকার প্রজনন কালে সবচেয়ে বিশেষ বেলা আসে লাল শাড়ী পরে গোধূলি ঝুলিয়ে রাখা ঠোঁটে। বাকি রাইরুহানের বেলাগুলি যখন তখন ঘটে, স্থির নেই, অবিকল প্রজনন ন্যায়। আমার প্রতিটি মুহূর্ত দ্বিচারী, আমার যেকোনো দুটি মুহূর্তই দ্বান্দ্বিক।
একটি মুহূর্তে বাঁদিকে ডুবে গিয়ে নিজেকে ডানদিক করে দেখি। পর মুহূর্তেই নিজেতে ডুবে গিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির বামত্ব অনুভব করি। এই স্ব-দ্বন্দ্ব আমার সৃষ্টিরহস্য প্রায়শঃই শ্ব-দন্তের ন্যায় তাকে ক্ষতবিক্ষত করে গেছে। কি যে লাজ পাই আমি এতে, যখনই রুহানিবেলা জাগে। যেমন এই রাত্রির প্রবল মাঝখান হঠাৎই এসে বেলা তার নিজস্ব রুহ্‌ জাগিয়ে তুলেছে বলে ককিয়ে উঠেছি। রাই মোহতরমা হে, আর কোনো সহন করাবো না, প্রকৃত, সত্যিই, শুধু নিজেকে সহ্য করবো আজীবন, কিন্তু শূন্যস্থান যে কিছুতেই সহে না, সয় না।
অকালচাঁদা বালক কপালে মনসাতলা নিয়ে জেগে আছে, তার কাঁটাভেঙে দুধ বয়ে যায়, তার সজল শাঁসখানি দুটি চোখের উপাদানে তৈয়ার, এই নিয়ে থাকতেই রাজি। মাথাটি নড়লে কাঁটাগাছ দুলে ওঠে। ওই কাঁটাগাছে তার জখমের জননী রয়েছে, তাই মাথার ভেতরে নিয়ে রেখেছি দেখো, আর বাইরে আনবো না, সত্যিই, কখনো না। সামান্য প্রঃশ্বাস তার, একখানি র দেবেনা আমাকে রাই? আর কিছুই তো চাইছিনা। রাইরুহানের কাল আমি রোজ, প্রত্যহ, প্রতি মুহূর্তে অভাব হতে সংগ্রহ করি।

রাইরুহানি কথা- চার

নিজেকে এক মুহূর্তে অভাব ও পরমুহূর্তে ভাব, এই দ্বন্দ্বপদ্ধতিতে এগোনোর পন্থা আমার। তার গোগ্রাসে রাই এর খুব আহত আহত করছে অকারণ। তাই স্থিরের ভেতরে কোনো স্থিতি, তারও ভেতরে কোনো স্থানু হয়ে আছি। অপেক্ষাস্থান নামে একটি দেশ হয়ে আছি জনবসতিহীন আমি একটি মানুষ। নিজদেশ হতে এসে সেই দেশ ছুঁয়ে একবার মমান্তর হয়ে তুমি দেশান্তরে যাও, বুনোমানুষের ত্রাণে ও উন্মুখে এক গোলাপী হলকা জানাও। অস্ফূট ইশারায়, দুর্বোধ্য শীৎকারে, যাতে খুশী হোক,শরীর মোচড়ে, আমূল ভেজা আর্তনাদে কোনো, জানাও উষ্ণ ঘন গাঢ় শুভ্র বাংলাভাষাটির তীব্র নিশানা।

যেভাবে খুশী, যেমন ধরো তোমাকে ছেড়ে যাওয়া দাঁতে দগ্ধ প্রঃশ্বাস আমাকে ছুঁয়ে গেলো। অর্থাৎ তোমার আহ্‌-সাম্রাজ্যে এক অতিসামান্য “হাহ্‌”। তাহলেই হবে।

আমি তো রুহানরাই, “ন” আমি স্বপ্নকে স্বপন করে দেখি রোজ, প্রতি মুহূর্তে নিজেকে যতন করে রাখি, তার থেকে ফোঁটা ফোঁটা “ন” আমি জমিয়ে রেখেছি। দাঁতে কামড়ানো ধাতব ধ্বনিটি যদি চুম্বনে ভাসে…

এবং পঞ্চমে ওঠা কথা-

জানা ও অজানা, নতুন ও পুরোনোর বাইরে এক তৃতীয় অবস্থায় আমি থাকবো চিরকাল। সমগ্র দোলন, ঢেউ, ঝড়, তীব্র ইত্যাদি নিজ অঙ্গে অঙ্গে ধারন করে সম্পূর্ণ সমুদ্রের মতো স্থির অগ্রগামী। গর্জন করবো বটে, তবে সে গর্জনে মিশে থাকবে পূর্ণ চাঁদের খিলখিল। দাঁড়িয়ে থাকবো আজীবন সমুদ্ররূপ। ঢেউ যাবে আসবে, ঝাপট উঠবে নামবে, কিন্তু তার অমনিবাস মানে আমি নয়।

আমার সমগ্র হে লবণনন্দিনী, সমুদ্ররূপ স্থির ও স্থানু থাকবে দাঁড়িয়ে, আপনার জন্য, তার সমস্ত তীব্রতা অস্থিরতা সহ, অতলান্তিক বা প্রশান্তসম স্থির। আমি জানি আপনি বিস্তীর্ণ ডাঙার মতো আমার পরেই রয়েছেন। আর দেখতে পেলে বালুকাবেলারূপ জড়িয়ে ধরবেন। সেখানেই আমি থেমে আপনি শুরু হবে।
সেভাবেই আছি, জল তার নিজ স্থল ছেড়ে কোথায় পালাবে বলুন? পালাতে কি পারে কখনো?

Comments

beta
Fairy Dust

Navigation

Languages

Social Media